সারা বাংলা খুলনা ঝিনাইদহ
কালীগঞ্জে শতবর্ষের সাক্ষী বটবৃক্ষ আজ মৃত্যুর প্রহর গুনছে : নেয় কার্যকর সংরক্ষণের উদ্যোগ
২৬ বাংলা টিভি 25-Sep-2026 12
কালীগঞ্জে শতবর্ষের সাক্ষী বটবৃক্ষ আজ মৃত্যুর প্রহর গুনছে : নেয় কার্যকর সংরক্ষণের উদ্যোগ
শাহিনুর রহমান পিন্টু, (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি: একসময় যার ছায়াতলে পথিকের ক্লান্তি দূর হতো, পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকত চারপাশ—সেই কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন বটবৃক্ষ এখন নিজেই যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বেথুলি গ্রামের মল্লিকপুরের ঐতিহাসিক বটবৃক্ষটি দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণে আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে।
স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মল্লিকপুরের বটগাছ’, ‘বেথুলীর বটগাছ’ কিংবা ‘সুইতলার বটগাছ’ নামে পরিচিত। জেলা প্রশাসনের পর্যটনবিষয়ক তথ্যেও এটিকে এশিয়ার বৃহৎ ও প্রাচীন বটবৃক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি তথ্যে গাছটির বয়স প্রায় ২০০ বছরের বেশি বলা হলেও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ২৫০ থেকে ৩০০ বছর বা তারও বেশি পুরোনো বলে উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় ইতিহাস ও বিভিন্ন প্রতিবেদন ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বছর আগে স্থানীয় এক কুমারের কুয়ার দেয়ালে বটগাছটির জন্ম হয়েছিল । সময়ের পরিক্রমায় মূল গাছটি মারা গেলেও তার শেকড় ও ডালপালা থেকে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য নতুন কাণ্ড।
বন বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে গাছটির ৪৫টি উপবৃক্ষ রয়েছে। এর ৩৪৫টি বায়বীয় মূল মাটিতে প্রবেশ করে নতুন কাণ্ডের রূপ নিয়েছে এবং ৩৮টি মূল এখনো ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। একটি গাছ—কিন্তু দেখলে মনে হয় যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য গাছের সারি। প্রকৃতির এই বিস্ময়ই মল্লিকপুরের বটবৃক্ষকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে বিশ্বব্যাপী। বটবৃক্ষটি সংরক্ষণের দায়িত্ব ২০০৯ সালে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয় । কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার এক যুগেরও বেশি সময় পরও প্রশ্ন উঠছে প্রাচীন এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্যবাহী বট বৃক্ষটি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ কোথায়? রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সামাজিক বন বিভাগের হাতে যাওয়ার পরও জমি অধিগ্রহণসহ উন্নয়নকাজে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং গাছের ডালপালা কেটে নেওয়া এবং পাশের রাস্তা ও অন্যান্য পরিবেশগত চাপের কারণে গাছটি দিনে দিনে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে । অর্থাৎ কাগজে-কলমে সংরক্ষণের দায়িত্ব থাকলেও মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরিচর্যা কতটা হচ্ছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেন বলেন,বন বিভাগ নয় ; আমরা স্থানীয়রা যতটুকু পারি এই বট গাছের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। বন বিভাগ নামে মাত্র দায়িত্বে। মেজর জিয়াউর রহমান এবং বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বট বৃক্ষ দেখতে এসেছিলেন। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আমি দাবি জানায়, প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই বটবৃক্ষটি সংরক্ষণপূর্বক এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বটবৃক্ষটির চারপাশে পর্যটন অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ অতীতেও নেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের জন্য ১৯৯০ সালে সেখানে একটি রেস্টহাউস নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৮ সালের দিকে বটবৃক্ষের চারপাশে প্রাচীর ও ফুলের বাগানও তৈরি করা হয়েছিল । কিন্তু সময়ের সঙ্গে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
অথচ সঠিকভাবে সংরক্ষণ, সৌন্দর্যবর্ধন, হাঁটার পথ, বসার স্থান, পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র এবং পর্যটকবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে মল্লিকপুরের বটবৃক্ষটি ঝিনাইদহের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারে বলে স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই বটবৃক্ষ শুধু একটি গাছ নয়—এটি কয়েক শত বছরের ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষী। তাই এর সংরক্ষণে শুধু গাছের ডালপালা রক্ষা করলেই হবে না; পুরো এলাকাকে একটি সমন্বিত ঐতিহ্য ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা দরকার।
তাদের দাবি, দ্রুত বটবৃক্ষটির সীমানা নির্ধারণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বায়বীয় ও ঝুলন্ত মূলগুলোর বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা করা,
গাছের ডালপালা কাটা বন্ধ করা, আশপাশের অবৈধ দখল ও আবর্জনা অপসারণ করা,
দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা,
পুরোনো স্থাপনা ও রেস্টহাউস সংস্কার করা এবং বটবৃক্ষকে ঘিরে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা। প্রয়োজন হলে উদ্ভিদবিদ, বন বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও প্রত্ন-ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা করার কথাও বলছেন সচেতন মহল। যে বটবৃক্ষ কয়েক শতাব্দী ধরে টিকে আছে, মানুষের অবহেলায় কি সেটিই শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যাবে? মল্লিকপুরের বটবৃক্ষের সামনে এখন এই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়ে
ছে। সময়মতো কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া না হলে একদিন হয়তো থাকবে শুধু ইতিহাসের পাতায় লেখা একটি নাম—‘মল্লিকপুরের প্রাচীন বটবৃক্ষ’।
কোটচাঁদপুর সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডেপুটি রেঞ্জার (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) প্রনব কুমার বিশ্বাস বলেন, এশিয়ার বৃহৎ বট বৃক্ষ খ্যাত মল্লিকপুরের এই বৃহৎ বটগাছ কেন্দ্র করে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যাপারে আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবো। আশা করি ঐতিহ্যবাহী এই গাছের রক্ষণাবেক্ষণ ও এটিকে একটা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বন বিভাগ যথাযথ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা( ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, বটবৃক্ষটি জানা মতে বন বিভাগের দায়িত্বে। সেখানকার উন্নয়নের ব্যাপারে আমি নিজে বন বিভাগের সাথে কথা বলব।
news@26banglatv.com