আন্তর্জাতিক
ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে মোদির আমন্ত্রণ, আলোচনায় গঙ্গা-তিস্তা চুক্তি
২৬ বাংলা টিভি 31-Jul-2026 12
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। ছবি: সংগৃহীত
২৬ বাংলা রিপোর্ট: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। এ লক্ষ্যে আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
আমন্ত্রণপত্রে মোদি বলেছেন, বর্তমানে বিমসটেকের (বিমসটেক) চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ সম্মেলনের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। একই সঙ্গে সম্মেলনের ফাঁকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেরও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, তিস্তার পানি ভাগাভাগি, সীমান্ত ও আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার এটিই হতে পারে একটি বড় সুযোগ। তবে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত না দেওয়া এবং অন্যান্য ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জনমত থাকায় তারেক রহমান এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গঙ্গা চুক্তি নবায়নের সময় ঘনিয়ে এসেছে
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তি নবায়ন বা সংশোধন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তি স্বাক্ষরের সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলে যাওয়া, শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়া এবং অনিয়মিত বর্ষণের কারণে গঙ্গার পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশের অভিযোগ, বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পানি পাওয়া যায়। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়েছে, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এ ছাড়া বর্তমান চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, বিরোধ নিষ্পত্তির স্বাধীন ব্যবস্থা কিংবা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর স্পষ্ট উল্লেখ নেই।
তিস্তা চুক্তি এখনও ঝুলে আছে
দুই দেশের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টনও দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত। ২০১১ সালে একটি খসড়া চুক্তিতে ভারতের জন্য ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের জন্য ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পানি বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে চুক্তিটি আর বাস্তবায়ন হয়নি।
এদিকে তিস্তা নদী উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। কারণ প্রকল্পটি ভারতের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেনস নেক’ করিডরের কাছাকাছি অবস্থিত।
৫৪টি অভিন্ন নদী দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শুধু গঙ্গা বা তিস্তাই নয়, মোট ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র, ফেনী, মনু ও বরাক উল্লেখযোগ্য। এসব নদীর পানি কৃষি, পানীয় জলের সরবরাহ, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং দুই দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব নদী ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি, নির্ভুল তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সম্পর্কে টানাপোড়েন
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ না করায় দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়।
একদিকে ভারত বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ অভিযোগ করেছে, ভারতীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়েও দুই দেশের সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।
নতুন ধরনের পানি ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অমিতাভ মাট্টুর মতে, গঙ্গা চুক্তি শুধু নবায়ন করলেই হবে না, বরং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুনভাবে সাজাতে হবে।
তিনি নদীর পানিপ্রবাহের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে বিনিময়, স্যাটেলাইট ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা, নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং বিরোধ দেখা দিলে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার সুযোগ রাখার সুপারিশ করেছেন।
আলোচনার জন্য অনুকূল সময়?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে নয়াদিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গে একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় তিস্তা ও অন্যান্য পানি বণ্টন ইস্যুতে সমঝোতার সম্ভাবনা আগের তুলনায় বেশি। অতীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি এগোয়নি।
তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতবিরোধী জনমতের কারণে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তার পরও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ব্রিকস সম্মেলনের সুযোগ কাজে লাগানো গেলে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা গঙ্গা ও তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্ত সহযোগিতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নতুন করে অগ্রগতির পথ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: ইউরেশিয়া রিভিস্তা ডি স্টুডি জিওপলিটিসি
news@26banglatv.com