অন্যান্য
বুকে ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য
২৬ বাংলা টিভি 01-Dec-2025 41
বুকে ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য
নিউজ ডেস্কঃ
মুজিবনগর ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের জন্মভূমি। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে যে অস্থায়ী সরকার শপথ নেয়, সেটিই ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত হয়। সেই ঐতিহাসিক স্থানের মর্যাদা ধরে রাখতে গড়ে ওঠে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স, যেখানে বাংলাদেশের মানচিত্র, ১১ সেক্টরের যুদ্ধের বিবরণ, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম এবং নানা ঘটনার প্রতীকী ভাস্কর্য তৈরি করা হয়।
কিন্তু গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এই কমপ্লেক্সে ঘটে বড় ক্ষতি। তিন শতাধিক ছোট-বড় ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। ভেঙে ফেলা হয় মুক্তিযুদ্ধের ১১ সেক্টরের বর্ণনা-সংবলিত ভাস্কর্য, লুট হয়ে যায় প্রধান ফটকের লোহার কাঠামো। ১৫ মাস পার হয়ে গেলেও সংস্কার কাজ শুরু হয়নি। ঐতিহাসিক এই কমপ্লেক্স আজও ক্ষতচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মুজিবনগর দিবসে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক বলেন, ইতিহাসের সত্য মুছে ফেলার চেষ্টা কখনো সফল হয় না। মুজিবনগর সরকারের নাম পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ বর্তমান সরকারের নেই। তিনি বলেন, মুজিবনগর সরকার দেশের সাংবিধানিক সরকার ছিল। এই সরকারের শপথ গ্রহণ স্বাধীনতার পথে এক গৌরবময় অধ্যায়, যা বিশ্বজুড়ে চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তিনি জানান, ৫ আগস্টের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত সংস্কার করা হবে।
স্মৃতিসৌধের কেয়ারটেকার সুভাষ মল্লিক ৩৫ বছর ধরে এই কমপ্লেক্স দেখভাল করছেন। তিনি জানান, দর্শনার্থীরা আগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে এখানে ভিড় করতেন। কিন্তু হামলার দিন বিকেলে আনসার সদস্যরা জায়গা ছেড়ে চলে গেলে দুর্বৃত্তরা একের পর এক ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে। লাইট, সিসি ক্যামেরা, ব্যাটারি, পানির পাম্পসহ নানা সরঞ্জাম খুলে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে লুট হতে দেখা বেদনাদায়ক।
গণপূর্ত বিভাগের তালিকা অনুযায়ী, কমপ্লেক্সে মোট ৬০০ ভাস্কর্য ছিল। এর মধ্যে মানচিত্রের ওপর নির্মিত প্রায় ২০০টি ছোট ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। সামনের বড় ভাস্কর্যের ৬৫টি এবং পূর্ব গ্যালারির ৩৫টি ভাস্কর্য নষ্ট করা হয়। সংরক্ষণের জন্য বসানো এসএস পাইপের পার্টিশনও তুলে নেওয়া হয়েছে। কমপ্লেক্সের আলোকসজ্জায় ব্যবহৃত প্রায় ৫০০ এলইডি, ফ্লাডলাইট ও আন্ডারওয়াটার লাইট লুট করা হয়। লুট হওয়া সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ২০টি সিসি ক্যামেরা, তিনটি মনিটর, কম্পিউটার, আটটি পানির পাম্প, হাইভোল্টেজ ব্যাটারি এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র।
১৯৭১ সালের শপথ অনুষ্ঠানে গার্ড অব অনার দেওয়া জীবিত দুই আনসার সদস্যের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিমুদ্দিন শেখ। সেই দিনের স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি জানান, ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যার পর মঞ্চ তৈরি শুরু হয়। রাতভর ভারতীয় সেনারা আমবাগানে পজিশন নেন। সকালে দেশি বিদেশি সাংবাদিকে এলাকা ভরে যায়। চার নেতার শপথ গ্রহণের পর তারা মুজিবনগর সরকারকে গার্ড অব অনার দেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট যারা ভাস্কর্য ভাঙল, তারা বুঝতে পারেনি কী ভেঙেছে। মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স রাষ্ট্রের সম্পদ, কোনো দলের সম্পদ নয়।
গার্ড অব অনারে অংশ নেওয়া আরেক আনসার সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন বলেন, তাদের বারো জনের দলে আজ বেঁচে আছেন মাত্র দুজন। তিনি জানান, শীতকালে হাজারো মানুষ এই কমপ্লেক্সে এসে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতেন। এখন ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্য আর লুট হওয়া সরঞ্জামের কারণে দর্শনার্থী কমে গেছে। তিনি দাবি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সব নিদর্শন দ্রুত পুনর্নির্মাণ করা হোক।
গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জামাল উদ্দিন জানান, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ঢাকার একটি টিম এসে পরিদর্শনও করেছে। সব মিলিয়ে অন্তত ৬০ লাখ টাকার সংস্কার প্রয়োজন। অর্থ বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু হবে।
মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পলাশ মণ্ডল বলেন, কমপ্লেক্সের দায়িত্ব চারটি বিভাগে ভাগ করা। ভাস্কর্যগুলো নিয়ে কাজ করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, আর অন্যান্য অবকাঠামো দেখছে গণপূর্ত বিভাগ। বর্তমানে ৬০ আনসার সদস্য এবং ১৫ জন ট্যুরিস্ট পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। সরকারি নির্দেশনা পেলেই সংস্কার শুরু করা হবে।
ঐতিহাসিক মুজিবনগর কমপ্লেক্স আজও ক্ষতের দাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের বেদনাময় অধ্যায়কে ধারণ করা এই স্থানটি সঠিকভাবে পুনর্নির্মাণ ও সংরক্ষণ করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও গভীরভাবে জানতে পারবে স্বাধীনতার ইতিহাস।
news@26banglatv.com