সারা বাংলা খুলনা ঝিনাইদহ
ইতিহাস বিখ্যাত নাচোল বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের ধ্বংসপ্রায় পৈতৃক বাড়ি বেদখলে
২৬ বাংলা টিভি 24-Jul-2026 19
ইতিহাস বিখ্যাত নাচোল বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের ধ্বংসপ্রায় পৈতৃক বাড়ি বেদখলে
শিপলু জামান , ঝিনাইদহ প্রতিনিধি : ইতিহাস বিখ্যাত নাচোল বিদ্রোহের কিংবদন্তি নেত্রী ইলা মিত্রের ˆপতৃক বাড়ি সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে| প্রত্নসম্পদ ঘোষণার ৯ বছরেও দখলমুক্ত হয়নি ইলা মিত্রের স্মৃতিবিজড়িত ˆপতৃক বাড়ি| ঐতিহাসিক নাচোল বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্র| যাকে বলা হয় নাচোলের রানি মা| নাচোল অঞ্চলটি চাঁপাইনবাবগঞ্জে হলেও ভূমিকন্যা ইলা মিত্রের বাড়ি ঝিনাইদহের ˆশলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামে| এই গ্রামের ˆপত্রিক বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে| প্রত্নসম্পদ হিসাবে ঘোষণা করে সরকারি গেজেট প্রকাশের প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও দখল মুক্ত করা যায়নি বাড়িটি| এই স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন এ দাবি সব মহলের|
ইতিহাস থেকে জানা যায়, নাচোল বিদ্রোহ ছিল ১৯৪৯ সালের শেষভাগ ও ১৯৫০ সালের প্রথম দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলায় সংঘটিত একটি কৃষক বিদ্রোহ, যা মূলত সাঁওতাল কৃষকদের নিয়ে গঠিত ও ইলা মিত্র এই আন্দোলনের প্রধান সংগঠক ছিলেন| এটি তেভাগা আন্দোলনেরই একটি অংশ ছিল, যেখানে কৃষকরা জমিদারদের শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিল| এটিও তেভাগা দাবিতে সংঘটিত হলেও পৃথক ও ¯^তন্ত্র ˆবশিষ্ট্য অনুযায়ী লড়াই-সংগ্রাম, দমন-পীড়নের কারণে ইতিহাসে নাচোল বিদ্রোহ নাম অভিহিত| যেখানে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ভাগাভাগি নিয়ে জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল| রাজশাহীর নবাবগঞ্জ অঞ্চলে নাচেল কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন কমিউনিটি পার্টি ও কৃষক সমিতির নেত্রী ইলা মিত্র| কৃষক আন্দোলন-সংগ্রামের সময় পুলিশের হাতে আটক হয়ে নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাকে| ¯^ামী কমরেড রমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে ভারতের মালদহের নাবাবগঞ্জ থানার রামচন্দ্র হাটের শ্বশুরের জমিদার বাড়িতে দিনাজপুর চলে আসেন তিনি| ইলা মিত্র ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী ¯^াধীনতান সংগ্রামী, ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদ|
ˆশলকুপার বাগুটিয়ার রায়পাড়া জরাজীর্ণ দ্বিতল ভবনটি নাচোল কৃষক আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের ˆপত্রিক বাড়ি| জন্ম কলকাতায় হলেও কিংবদন্তি এ নেত্রীর ছোট বেলার সময় কেটেছে এই বাড়িতেই| ১৭ শতক জমির উপর দোতলা ও একতলা দুটি ভবনে ৯টি কক্ষ আর একটি প্রধান ফটকযুক্ত ও শানবাঁধানো পুকুরসহবাড়িটি অযত্ন আর অবহেলায় এর অস্তিত্বই আজ বিলীন হওয়ার পথে| একটি ভবনের ছাদের অনেকাংশই ভেঙে পড়েছে, দেয়ালে ধরেছে ফাটল| এছাড়া ˆপতৃক স্থানটি প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা হওয়ার প্রায় ৯ বছরেও দখলমুক্ত করা হয়নি বাড়িটি| এমনকি যারা ভোগদখল করছেন তাদের বাঁধায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কোনো সাইনবোর্ডও দিতে পারেননি|
জানা গেছে, ঝিনাইদহের ˆশলকুপা শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে ১৩ কিলোমিটার দুরের গ্রাম বাগুটিয়া| গ্রামের জরাজীর্ণ ও কর্দমাক্ত মেঠোরাস্তার পাশে চুন-সুড়কি দিয়ে গাঁথা ৯টি কক্ষের কারুকার্যখচিত নকশার পুরনো ভবন| ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে এই বাড়িটি নির্মাণ করেন ইলা মিত্রের ঠাকুরদাদা রাজমোহন সেন| পূর্বপুরুষেরা দেশত্যাগের পর বাড়িটি দখল হয়ে যায়| শুধু বাড়ি নয়, দখল করা হয়েছে ইলা মিত্রের বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের রেখে যাওয়া শত-শত বিঘা জমি| ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বাড়িসহ ২২ শতক জমি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়| ওই মাসেই গেজেটও প্রকাশ করা হয়| কিন্তু প্রায় ৯ বছরেও দখলমুক্ত করা হয়নি বাড়িটি| বসবাসকারীদের দাবি, বাড়িটি কিনে নেন জনৈক খোদাবক্স কাছ থেকে ক্রয়সূত্রে বাড়িটির মালিক হন হাজী কিয়াম উদ্দিন| ১৯৭০ থেকে বাড়িটিতে বসবাস করছেন কিয়াম উদ্দিনের উত্তরসূরীরা|
কিয়াম উদ্দিনের তৃতীয় প্রজন্মের উত্তরসূরি আবু বকর জানান, ‘প্রতিবছরই আমাদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়| আজ পর্যন্ত রাস্তাটিও সংস্কার করা হয়নি|’ লোকজন আসাতে তারা বিরক্ত ও হয়রানির ¯^ীকার হচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি |
১৯৭১ সালে দেশ ¯^াধীন হওয়ার পর থেকে সাধারণ মানুষের মাঝে ইলা মিত্রকে নিয়ে নতুন করে জাগরণ সৃষ্টি হয়| বার বার দাবি উঠে তার ˆপত্রিক ভিটা দখলমুক্ত করার| ২০১১ সাল থেকে সাংগঠনিকভাবে ইলা মিত্রের ˆপতৃক বাড়ি সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়| ঝিনাইদহ, ˆশলকুপা ও ঢাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিলসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ¯^ারকলিপি পেশ করা হয়| পরবর্তীতে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় পুরাকীর্তি হিসেবে বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য গেজেট প্রকাশ করেন| তবে প্রত্নসম্পদ ঘোষণার প্রায় ৯ বছরেও জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় ইলা মিত্রের ˆপতৃক বাড়িটি সংরক্ষণে কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি|
news@26banglatv.com