সারা বাংলা খুলনা ঝিনাইদহ
বিএনপির দুর্গে জামায়াতের হানা: ঝিনাইদহে ধানের শীষের ভরাডুবির নেপথ্যে কি ঘরশত্রু বিভীষণ ও আ’লীগ প্রীতি?
২৬ বাংলা টিভি 01-Mar-2026 94
বিএনপির দুর্গে জামায়াতের হানা: ঝিনাইদহে ধানের শীষের ভরাডুবির নেপথ্যে কি ঘরশত্রু বিভীষণ ও আ’লীগ প্রীতি?
আসিফ ইকবাল কাজল,ঝিনাইদহঃ
ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঝিনাইদহের তিনটি সংসদীয় আসনে ভুমিধ্বস পরাজয়ে বিএনপির তৃণমুলের কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। আসন হারানোর শোক তারা সহ্য করতে পারছে না। নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পার হলেও শহর থেকে গ্রামের চায়ের স্টলগুলোতে বিএনপির পরাজয়ের নেপথ্যের কারণগুলো নিয়ে মানুষ আলোচনা সমালোচনার ঝড় তুলেছেন।
ঝিনাইদহ বিএনপির রাজনীতি একটি শক্তিশালী ভীতের উপর ছিল। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা চারবার জেলার চারটি আসনে জয়ী হয়ে বিএনপির তাদের সাংগঠনিক ভীত মজবুত করেছিল। প্রতিটি নির্বাচনে বিপুল পরিমান ভোট পেয়ে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন। আর আওয়ামীলীগ ছিল দ্বিতীয় পর্যায়ে। দীর্ঘদিনের সেই শক্ত সংগঠনিক ভীত ভোটের মাঠ নড়বড়ে করে দিল তৃতীয় স্থানে থাকা জামায়াত।
অনেকে মনে করেন ভোটের মাঠে আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদের আসার সুযোগ করে দেওয়া বিএনপির ভরাডুবির অন্যতম কারণ। ইউনিয়ন ও গ্রামের অনেক নেতাকর্মী নাখোশ হয়ে পড়েন আ’লীগ নেতাদের দিয়ে ধানের শীষে ভোট চাওয়ানোর কারণে। হরিণাকুন্ডু ও ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় আ’লীগের চিহ্নিত নেতাকর্মীরা ধানের শীষে ভোট করেন, যাদের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাকর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে নির্যাতিত বিএনপি নেতাকর্মী ও তাদের পরিবার গোপনে জামায়াতের পক্ষে ভোট দিয়ে ধানের শীষের পরাজয়ে বড় ভুমিকা রাখেন।
এছাড়া আসন হারানো সংসদীয় এলাকায় কমবেশি দলীয় কোন্দল, জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপির দুর্বল প্রার্থী দেওয়া, পাড়া মহল্লায় চাঁদাবাজী, পরিবহন স্ট্যান্ড ও বিরোধপুর্ন জমি দখল, বিচার শালিসের নামে অবিচার করা, হাট বাজার, বিল বাওড় দখল ও কতিপয় নেতার অস্বাভিক সম্পদ বৃদ্ধি এই পরাজয়ের বড় দায় বর্তায় বিএনপির জেলা পর্যায়ের কতিপয় নেতার ওপর, যাদের কর্মকান্ড দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলে অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছিল।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির অনেক সমর্থক এমনকি গ্রাম ও ইউনিয়নের নেতার স্ত্রী সন্তানরা জামায়াতের পক্ষে ভোট করেছেন। এমনও দেখা গেছে স্বামী বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতি, কিন্তু স্ত্রী জামায়াতের রুকন। এ কারণে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপির এমন চার নেতাকে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মুলত তারা বিএনপির পক্ষে ভোট করেননি। আবার ঝিনাইদহের জাহেদী ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রভাবশালী বড় প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার কর্মী সমর্থক শেষ মুহুর্তে বিএনপির প্রার্থীর উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তাদের ভোট ব্যাংক নির্বাচনে বড় একটি ব্যবধান গড়ে দেয়।
তৃণমুল বিএনপির অভিযোগ, সদর উপজেলার মধুহাটী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহম্মেদ জুয়েল, পৌর এলাকার খাজুরা গ্রামে যুবলীগ নেতা সাইদ, জেলার পুর্বাঞ্চলে চেয়ারম্যান কাজল, রিপন, বিকাশ বিশ্বাস, সাধুহাটী ইউনিয়নে নাজির উদ্দীন, আলতাফ ও হরিণাকুন্ডু উপজেলায় আবুল কালাম ও শিলুসহ আওয়ামীলীগের বিতর্কিত নেতাদের মাঠে নামানো হয় ধানের শীষের প্রচার কাজে। আবার অনেক আ’লীগের সমর্থক বিএনপির ছত্রছায়ায় আত্মগোপন থেকে ফিরে দাড়িপাল্লায় ভোট দেন বলেও প্রচার রয়েছে। এসব কারণে ঝিনাইদহ-২ আসনে আব্দুল মজিদ, ঝিনাইদহ-৩ আসনে মেহেদী হাসান রণি ও ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী রাশেদ খান পরাজয় বরণ করেন।
মহেশপুর উপজেলা নেপা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমিনুর রহমান অভিযোগ করেন, বিএনপির নারী কর্মীদের সংগঠনে কৌশলগত ব্যর্থতাও ছিল নির্বাচনে দৃশ্যমান। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগভিত্তিক কাজ ও বৈঠকের নামে জামায়াত যে নীরব সংগঠন গড়ে তুলেছিল, তার পাল্টা প্রস্তুতি গ্রহন করেনি বিএনপি। ফলে বহু এলাকায় নারী ভোটব্যাংক ধরে রাখায় কঠিন হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কেন্দ্রে কেন্দ্রে জামায়াত সমর্থিত নারীদের উপস্থিত ছিল চোখে পড়ার মতো।
নির্বাচনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল মামলা, হামলা ও নির্যাতনের শিকার কর্মীদের অবমুল্যয়ন করে ৫ আগষ্টের পর গজিয়ে ওঠা বিএনপির নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন ও নেতৃত্বের আসনে বসানো। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মাঠকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করা। ফলে গ্রামে গ্রামে প্রচারযুদ্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যম দেখা যায়নি। নির্বাচনের দিন কেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয় অত্যন্ত দূর্বল ছিল, ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করার কার্যকর পরিকল্পনা ছিল না। বিপরীতে প্রতিপক্ষ জামায়াত ছিল সংগঠিত, লক্ষ্যভিত্তিক ও কৌশলী। তারা ভোর সাকালে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোটারদের মনস্তাত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অনুকুলে জনসমর্থন আনতে সক্ষম হয়।
পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মজিদ জানান, ঝিনাইদহ-২ আসনে দেরিতে মনোনয়ন ঘোষনা করায় বিএনপির সাধারণ ভোটাররা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় তারা অপক্ষো করতে করতে জামায়াতের কব্জায় চলে যায়। এছাড়া জামায়াতের কালো টাকা, বিএনপির কতিপয় নেতার বিতর্কিত কর্মকান্ড ও জাহিদী ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের বিশ্বাসঘাতকতা পরাজয়ে বড় ভুমিকা রাখে। তারাও কালো টাকা ছড়িয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থা নেয়।
ঝিনাইদহ-৩ আসনের প্রার্থী মেহেদী হাসান রণি বলেন, জামায়াত নির্বাচনে কালো টাকা ব্যায় করে তাদের নারী কর্মীদের দিয়ে গ্রামের সাধারণ নারী ভোটারদের বাগে আনতে সক্ষম হয়। সাথে ধর্মের অপব্যাখা দিয়ে নারী ভোটারদের বিভ্রান্ত করে। এছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কিছু নেতা ভোটের মাঠে নামেনি। তারা কাজ করলে নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভব হতো, কারণ ইতিপুর্বে এই আসনে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে ভোট করে জিততে পারেনি।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী রাশেদ খান জানান, তিনি মুলত ঝিনাইদহ-২ আসনের জন্য প্রস্তুত নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে অন্য আসনে দেওয়া হয়। এর কারণে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে তার ভোট কাটাকাটি হয়। এছাড়া বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিশ্বাসঘাতকতা ও জামায়াতের কালো টাকা বিএনপির পরাজয়ে বড় ভুমিকা রাখে।
news@26banglatv.com