লাইফস্টাইল
ইফতারের পর ধূমপান: নীরবে বাড়ছে ঝুঁকি
২৬ বাংলা টিভি 22-Feb-2026 58
ইফতারের পর ধূমপান: নীরবে বাড়ছে ঝুঁকি
লাইফস্টাইল ডেস্ক:
রমজানের দিনভর সংযমের পর ইফতার শুধু ক্ষুধা নিবারণের মুহূর্ত নয়, এটি শরীর ও মনের পুনরুদ্ধারের সময়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে চায়। কিন্তু এই সংবেদনশীল মুহূর্তেই অনেকের হাতে উঠে যায় সিগারেট। কারও কাছে এটি অভ্যাস, কারও কাছে সারাদিনের চাপ ঝেড়ে ফেলার উপায়। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে—ইফতারের পর ধূমপান স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
রোজার কারণে পাকস্থলী দীর্ঘ সময় খালি থাকে। ইফতারের পরপরই ধূমপান করলে সিগারেটের নিকোটিন ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান দ্রুত রক্তে মিশে যায়। ফলে মাথা ঘোরা, বমিভাব, বুক ধড়ফড়ের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেকে এগুলোকে সাময়িক ভাবলেও এগুলোই হতে পারে শরীরের সতর্কবার্তা।
ইফতারের খাবার পাকস্থলীতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে হজমপ্রক্রিয়া শুরু হয়। এই সময়ে ধূমপান পাকস্থলীর রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয় এবং অ্যাসিডের মাত্রা বাড়ায়। এর ফল হিসেবে গ্যাস্ট্রিক, অম্বল, বুকজ্বালা বা খাবার উপরে উঠে আসার সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে আলসারের ঝুঁকিও বাড়ে। রমজানে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বাড়ার পেছনে ইফতারের পর ধূমপান একটি সাধারণ কারণ বলে চিকিৎসকেরা উল্লেখ করেন।
হৃদযন্ত্রের ওপরও পড়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব। নিকোটিন স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে হৃদস্পন্দন বাড়ায় এবং রক্তচাপ হঠাৎ বৃদ্ধি করতে পারে। যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সময় ধূমপান হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও বাড়াতে পারে।
সারাদিন ধূমপান না করায় ফুসফুস কিছুটা বিশ্রাম পায়। কিন্তু ইফতারের পর ধোঁয়ার তীব্র সংস্পর্শে শ্বাসনালিতে জ্বালা ও প্রদাহ তৈরি হয়। কাশি, শ্বাসকষ্ট বা বুক ভারী লাগার মতো উপসর্গ তখনই দেখা দিতে পারে। হাঁপানি রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ধূমপানের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে অক্সিজেন পরিবহনে। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা কার্বন মনোক্সাইড রক্তের অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ইফতারের পর শরীর যখন খাবার থেকে শক্তি নিতে শুরু করে, তখন অক্সিজেনের ঘাটতি ক্লান্তি ও মাথাব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে। অনেকেই ‘হালকা লাগা’ অনুভব করেন, যা আসলে সাময়িক অক্সিজেন ঘাটতির ফল।
রোজার দিনে শরীর এমনিতেই পানিশূন্যতার ঝুঁকিতে থাকে। ধূমপান সেই প্রবণতা আরও বাড়ায়। ফলে মুখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা তীব্র হতে পারে। এতে পরের দিনের রোজাও কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে।
রক্তে শর্করার ভারসাম্যেও প্রভাব পড়ে। ইফতারের খাবারের পর স্বাভাবিকভাবেই রক্তে গ্লুকোজ বাড়ে, কিন্তু নিকোটিন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। তাই চিকিৎসকেরা রমজানে ইফতারের পর ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দেন।
লিভার যখন খাবারের পুষ্টি প্রক্রিয়াজাত করতে ব্যস্ত, তখন ধূমপানের বিষাক্ত উপাদান একসঙ্গে প্রবেশ করলে তার ওপর চাপ বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিপাকক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে দাঁত, মাড়ি ও গলার ক্ষতিও দ্রুত বাড়ে—দাঁতে দাগ, মুখে দুর্গন্ধ এবং প্রদাহের ঝুঁকি তৈরি হয়। দীর্ঘদিনে মুখ ও গলার ক্যানসারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আসক্তি। সারাদিন বিরত থাকার পর ইফতারের প্রথম সিগারেট মস্তিষ্কে ‘পুরস্কার’ সংকেত তৈরি করে, যা ধূমপানের মানসিক নির্ভরতা আরও গভীর করে। অনেকেই রমজানকে ধূমপান কমানোর সুযোগ হিসেবে নিতে চান, কিন্তু ইফতারের পর সিগারেট সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।
news@26banglatv.com