সারা বাংলা খুলনা ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ৮০ বছর ধরে তিন প্রজন্মের সঙ্গী তিন টাকার একটি বাইসাইকেল
২৬ বাংলা টিভি 25-Aug-2026 16
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ৮০ বছর ধরে তিন প্রজন্মের সঙ্গী তিন টাকার একটি বাইসাইকেল
শিপলু জামান ঝিনাইদহ প্রতিনিধি :৮০ বছর আগে কেনা একটি বাইসাইকেল চালাচ্ছেন ওয়াহেদ আলী শেখ।
তাও আবার তিন টাকায় কেনা একটি বাইসাইকেল। কেটে গেছে দীর্ঘ ৮০ বছর। এত বছর পরে সেটি এখনো চলছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের স্মৃতি ও আবেগ আর ভালোবাসা।
১৯৪৬ সালে যশোর শহর থেকে মাত্র তিন টাকা দিয়ে ইংল্যান্ডের ‘র্যালি’ ব্র্যান্ডের বাইসাইকেলটি কিনেছিলেন ইউসুফ আলী শেখ।
তখন তিনি তহশিল অফিসে চাকরি করতেন।
অফিসে যাতায়াতের জন্য বাইসাইকেলটি ব্যবহার করতেন। এরপর নানা হাত ঘুরে সেই বাইসাইকেল এখন ব্যবহার করছেন তাঁর ভাতিজার ছেলে ওয়াহেদ আলী শেখ (৫২)।
ওয়াহেদ আলী শেখের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী গ্রামে। তিনি মৃত আনসার আলী শেখের বড় ছেলে। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ওয়াহেদ আলী জানান, তাঁর বাবা আনসার আলী শেখ ছিলেন ইউসুফ আলী শেখের ভাতিজা। ইউসুফ আলী ও পাচু শেখ ছিলেন দুই ভাই। পাচু শেখের তিন ছেলে—ইমান আলী শেখ, সাহাদ আলী শেখ ও আনসার আলী শেখ।
ওয়াহেদ আলী তাঁর বাবা আনসার আলী শেখের কাছে সাইকেলটির গল্প শুনেছেন। সাইকেলটি কেনার প্রায় আট-নয় বছর পর ইউসুফ আলী অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন সাইকেলটি তাঁর বাড়িতেই ছিল। ইউসুফ আলী তাঁর ভাইঝি জাহারন নেছাকে খুব ভালোবাসতেন। একদিন তিনি তাঁকে সাইকেলটি উপহার দেন। তবে জাহারন নেছা সাইকেল চালাতে পারতেন না। তাই তাঁর ভাই আনসার আলী সাইকেলটি নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন।
বাবার হাত থেকে ছেলের হাতে আনসার আলী শেখ পেশায় ছিলেন সাইকেলমিস্ত্রি।
কালীগঞ্জ শহরের ভূষণ স্কুল সড়কে তাঁর সাইকেল মেরামতের দোকান ছিল। পরে গান্না সড়কে দোকান করেন। দীর্ঘদিন তিনি বাড়ি থেকে দোকানে যাতায়াত করেছেন এই সাইকেলেই। সাইকেলটির খুব যত্ন নিতেন তিনি। সামান্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে নিজেই মেরামত করতেন। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বদলানো হলেও সাইকেলটির মূল কাঠামো এখনো আগের মতোই আছে।
আনসার আলী মারা যাওয়ার পর সাইকেলটি তাঁর বড় ছেলে ওয়াহেদ আলী শেখের হাতে আসে। তিনি সাইকেলমিস্ত্রি নন, তবে বাবার মতোই যত্ন করে ব্যবহার করেন। জরুরি প্রয়োজনে এখনো ওই সাইকেলেই ছুটে যান তিনি। একটু দূরে কোথাও যেতে হলেও সেটিই তাঁর সঙ্গী হয়। ওয়াহেদ আলী বলেন, ‘বাবার কাছ থেকেই সাইকেলটি পেয়েছি। যত্ন করে ব্যবহার করছি। আশা করি, আরও অনেক বছর ব্যবহার করতে পারব।
বাইসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে সেটির গল্প বলতে থাকেন ওয়াহেদ আলী শেখ। সম্প্রতি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার চাপালী গ্রামে
বাইসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে সেটির গল্প বলতে থাকেন ওয়াহেদ আলী শেখ।
ওয়াহেদ আলীর ভাই আবদুস সামাদ জানান, তাঁর বাবা আনসার আলী শুধু যাতায়াতের জন্য নয়, বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের কাজেও সাইকেলটি ব্যবহার করতেন। এলাকার অনেকে প্রয়োজনের সময় তাঁর বাবার কাছ থেকে সাইকেলটি ধার নিয়ে যেতেন। কাজ শেষে আবার ফিরিয়ে দিতেন।
আবদুস সামাদ বলেন, ‘বাবা সাইকেলটাকে খুব যত্ন করে রাখতেন। এখন বড় ভাইও বাবার মতো করে যত্ন করেন। সাইকেলটা দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এটা এত পুরোনো।’ তিনি জানান, এখনো ওয়াহেদ আলীর পাশাপাশি অন্য ভাইয়েরাও জরুরি প্রয়োজনে সাইকেলটি ব্যবহার করেন।
সাইকেলটি তাদের ভালোবাসা ও যত্নের প্রতীক।
চাপালী গ্রামের বাসিন্দা গোলাম সরোয়ার (৭৫) জানান, ছোটবেলা থেকেই আনসার আলী শেখকে এই সাইকেল চালিয়ে চলাফেরা করতে দেখেছেন। আট দশক পেরিয়েও সাইকেলটি সচল থাকার কারণ জানতে চাইলে তাঁর সহজ উত্তর ভালোবাসা আর যত্ন নিলে যেকোনো জিনিসই দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব।
তিন টাকায় কেনা সেই সাইকেল এখন আর শুধু একটি পুরোনো বাহন নয়।
তিন প্রজন্ম ধরে রাখা একটি পরিবারের স্মৃতি, ভালোবাসা ও যত্নের প্রতীক হিসেবেই দেখছেন। এ ব্যাপারে কালিগঞ্জ পরিবেশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান বলেন এটি একটি ঐতিহাসিক সাইকেল এমনটি আমাদের এলাকায় কম দেখা যায়
news@26banglatv.com