সারা বাংলা খুলনা নড়াইল
বর্ষায় বন্দি নড়াইলের লাখো মানুষ, ২ কিমির রাস্তা কাঁদাজলে ‘এর ফলে বিয়েও ভেঙে যায়
২৬ বাংলা টিভি 13-Jul-2026 33
বর্ষায় বন্দি নড়াইলের লাখো মানুষ, ২ কিমির রাস্তা কাঁদাজলে ‘এর ফলে বিয়েও ভেঙে যায়
মোস্তফা কামাল,নড়াইল : আষাঢ়-শ্রাবণের আকাশ মেঘলা হলেই বুক কেঁপে ওঠে নড়াইল সদর উপজেলার দূর্বাজুড়ি, সীতারামপুর কিংবা হিজলডাঙ্গার মানুষের। বর্ষা নামলেই বিছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয় এই গ্রামীণ জনপদগুলো। মাঠের ফসল ঘরে তোলা তো দূরের কথা, সামান্য ২ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার কাদার চাদরে ঢাকা পড়ে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের যান চলাচল। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। সড়কটির এই অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে ভুক্তভোগী মানুষ সরকারি দপ্তরে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসের বাণী শুনলেও বাস্তবে সড়কের কোনো উন্নয়ন ছোঁয়া লাগেনি। সদর উপজেলার মূলিয়া ইউনিয়নের দূর্বাজুড়ি গ্রাম থেকে সীতারামপুর অভিমুখী গ্রামীণ সড়কটির পাশে থাকা কয়েক গ্রামের বাসিন্দাদের পাকা রাস্তার দাবি বহু পুরনো।
দূর্বাজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন,আমাদের গ্রামে তিন থেকে চারবার এমপি এসে রাস্তা দেখে গেছেন। তারা আশ্বস্ত করে যান রাস্তা হবে, কিন্তু আর হয় না। আমাদের এক মণ ধান হাটে নিতে হলে ৪০ থেকে ৫০ টাকা ভ্যানভাড়া দিতে হয়, তাও কাদার ভয়ে তারা আসতে চায় না। এই বর্ষা মৌসুমে যাতায়াতের কষ্টের কারণে আমাদের গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে পর্যন্ত হতে চায় না। আমরা দ্রুত এই রাস্তা পাকা চাই।
শুধু এই দুই গ্রামই নয়, হিজলডাঙ্গা ও ইচড়বাহা সহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের চলাচল এই রাস্তাতেই। বর্ষা এলেই কাদায় ডুবে যাওয়া এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের কাদা মাড়িয়ে যেতে হয়। কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমীর গোলদার বলেন, "সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে ওঠে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যার সম্মুখীন হয়। রাতে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কোনো গাড়ি পাওয়া যায় না। রোগীকে নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। রাস্তাটি পাকাকরণে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করি।"
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্ভোগের এই চিত্র শুধু এই এলাকাতেই নয়, জেলার তিনটি উপজেলাতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক এখনও কাঁচা রয়ে গেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে নড়াইল জেলায় মোট ৩ হাজার ২২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ১ হাজার ৪৪৭টি সড়ক রয়েছে, যার ৬০ শতাংশই এখনও কাঁচা।
এর মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলায় মোট ১ হাজার ১৮১ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৭৩৮ কিলোমিটারই কাঁচা সড়ক, অর্থাৎ এই উপজেলায় কাঁচা সড়কের হার ৬২ শতাংশ। লোহাগড়া উপজেলায় ১ হাজার ১৯৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কাঁচা সড়ক রয়েছে ৭৮৯ কিলোমিটার, যা মোট সড়কের ৬০ শতাংশ। আর কালিয়া উপজেলায় মোট ৭৪৫ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৪৩৩ কিলোমিটার সড়কই কাঁচা রয়ে গেছে, যা শতকরা হিসাবে ৫৮ শতাংশ। তবে গ্রামীণ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ লাঘবে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ কিছু নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এলজিইডিতে নতুন সড়ক তালিকা আইডিভুক্ত (গেজেট) করার জন্য ইতোমধ্যে ৯৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ১ হাজার ১০০টি কাঁচা সড়কের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এর পাশাপাশি আরও ২৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ২১৪টি কাঁচা সড়ক নতুন করে তালিকাভুক্ত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ভুক্তভোগী গ্রামীণ মানুষের দাবি, শুধু খাতা-কলমে বা তালিকায় নাম ওঠানো নয়; বর্ষার এই চরম নরকযাতনা থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে গ্রামীণ সড়কগুলো যেন দ্রুত পাকাকরণ করা হয়।
স্থানীয় সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার ইকরামুল কবীর বলেন,জেলায় ৬০% রাস্তা এখনও কাঁচা আছে। বর্তমান অর্থ বছরে কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু রাস্তা সংস্কার জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে।কিছু রাস্তা টেন্ডারে আছে। নড়াইল জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন ও বৃহত্তর যশোর জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এটি প্রক্রিয়াধীন আছে। এই প্রকল্প গুলো পাস হয়ে গেলে আগামী অর্থ বছরে কাঁচা এবং পাকা রাস্তা ৫০ শতাংশে আনতে পারব।
news@26banglatv.com