সারা বাংলা খুলনা ঝিনাইদহ
ধান ক্ষেতে মিলল বিপন্ন মেছো বাঘের দুই ছানা: পিটিয়ে না মেরে পরম মমতায় বাঁচালেন যুবক।
২৬ বাংলা টিভি 06-May-2026 27
ধান ক্ষেতে মিলল বিপন্ন মেছো বাঘের দুই ছানা: পিটিয়ে না মেরে পরম মমতায় বাঁচালেন যুবক।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
ফসলের মাঠে ধান কাটার উৎসবমুখর পরিবেশ মুহূর্তেই রূপ নিয়েছিল তীব্র আতঙ্ক আর উত্তেজনায়। চোখের সামনে বাঘের বাচ্চার মতো দেখতে দুটি ছানা দেখে যখন লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে আসছিল উৎসুক জনতা, ঠিক তখনই দেবদূতের মতো আবির্ভূত হলেন এক যুবক। পরম মমতায় আগলে নিলেন ক্ষুধার্ত ও ভীত ছানা দুটিকে। এরপর পরম যত্নে দুধ খাইয়ে সুস্থ করে তুলে দিলেন বন বিভাগের হাতে।
বুধবার সকালে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার নাটিমা ইউনিয়নের নাটিমা মাঠে ঘটেছে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতা ও মানবিকতার এক বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। উদ্ধার হওয়া প্রাণী দুটি মূলত পরিবেশের বন্ধু ও বিপন্ন প্রজাতির 'মেছো বাঘ'।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ বুধবার সকালে প্রতিদিনের মতোই নাটিমা মাঠে কৃষকরা ধান কাটছিলেন। দুপুরের তীব্র রোদের ঠিক আগে, ধান কাটার একপর্যায়ে হঠাৎই একটি ঝোপের আড়ালে অদ্ভুত দর্শনের দুটি ছোট প্রাণীর নড়াচড়া চোখে পড়ে কৃষকদের। ছানা দুটির গায়ের ডোরাকাটা দাগ দেখে মুহূর্তের মধ্যে মাঠে শোরগোল পড়ে যায়—"বাঘের বাচ্চা পাওয়া গেছে!"
খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই লাঠিসোটা নিয়ে শত শত উৎসুক মানুষের ভিড় জমতে শুরু করে। আতঙ্কিত জনতা যখন প্রাণী দুটিকে আঘাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই সেখানে উপস্থিত হন পাশ্ববর্তী পাতিবিলা গ্রামের জামালের ছেলে হাবিব।
আগলে নিলেন যুবক হাবিব
তড়িৎ বুদ্ধিমত্তা ও পরিবেশ সচেতনতার পরিচয় দিয়ে হাবিব প্রাণী দুটিকে 'মেছো বাঘের ছানা' হিসেবে শনাক্ত করেন। তিনি বুঝতে পারেন, মা-হারা ছানা দুটি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত এবং মানুষের চিৎকারে ভীষণ ভীত। তিনি উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করেন এবং নিজের দায়িত্বে ছানা দুটিকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যান।
বাড়িতে নিয়ে তিনি পরম মমতায় ছানা দুটিকে ফিডারে করে দুধ খাওয়ান এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এ বিষয়ে হাবিব বলেন:
"প্রাণী দুটিকে দেখে আমার ভীষণ মায়া লেগেছিল। ধান কাটার সময় মা-হারা হয়ে পড়া ছানাগুলো ক্ষুধায় ছটফট করছিল। আমি শুধু একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মানবিক দায়িত্বটুকু পালন করেছি মাত্র।"
"এমন দৃশ্য আগে দেখিনি"— এলাকাবাসীর কণ্ঠে প্রশংসা
দুপুর বেলা নাটিমা মাঠে গিয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে। এলাকার সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে এখন আতঙ্কের বদলে স্বস্তি আর হাবিবের প্রতি শ্রদ্ধা।
স্থানীয় কৃষক আলতাফ হোসেন (৪৫) বলেন: > "আমরা তো প্রথমে মনে করেছিলাম সত্যি সত্যি বাঘের বাচ্চা! মানুষ যেভাবে লাঠিসোটা নিয়ে আসছিল, হাবিব না থাকলে ছানা দুটি আজ বাঁচত না। ও আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা বুঝতে পেরেছি, সব বন্যপ্রাণী মানুষের ক্ষতি করে না।"
গৃহিণী মাজেদা বেগম (৩৮) জানান: > "আমরা সাধারণ মানুষ বন্যপ্রাণী দেখলেই ভয় পাই। কিন্তু হাবিব যেভাবে বাচ্চা দুটোকে কোলে নিয়ে দুধ খাওয়াল, তা দেখে আমাদের বুকটা ভরে গেছে। ওর এই ভালোবাসার কাজ আমাদের সবার জন্য একটা বড় শিক্ষা।"
খবর পেয়ে আজ দুপুরেই মহেশপুর বন বিভাগের কর্মকর্তারা হাবিবের বাড়ি থেকে ছানা দুটিকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেন।
মহেশপুর বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার শফিকুল ইসলাম এই প্রতিবেদকের কাছে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন:
"উদ্ধার হওয়া প্রাণী দুটি মূলত মেছো বাঘ (Fishing Cat)। এটি আমাদের দেশে একটি অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। সাধারণত ঝোপঝাড় বা ধান ক্ষেতেই এরা বাচ্চা প্রসব করে। মানুষ না বুঝে প্রায়ই এদের পিটিয়ে মেরে ফেলে, যা আমাদের জীববৈচিত্র্যের জন্য এক চরম বিপর্যয়। হাবিব যে মানবিকতা ও সচেতনতা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অসাধারণ ও প্রশংসনীয়।"
তিনি আরও জানান, দুপুরের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ শেষে ছানা দুটিকে সুস্থ পাওয়া গেছে। মেছো বাঘের মা সাধারণত আশেপাশেই থাকে এবং রাতের অন্ধকারে সন্তানদের খোঁজে ফিরে আসে। তাই আজ রাতেই ছানা দুটিকে যে স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, তার আশেপাশেই মা বাঘের সান্নিধ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য অবমুক্ত করা হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরে যাওয়াই এই ছানাগুলোর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।
পরিবেশবিদদের মতে, মেছো বাঘ ফসলি জমির ক্ষতিকারক ইঁদুর ও পোকা দমনে কৃষকদের পরোক্ষভাবে বড় সাহায্য করে। প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রাণীর গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বন্যপ্রাণী দেখে আতঙ্কিত না হয়ে সরাসরি বন বিভাগকে জানানোর জন্য সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে। হাবিবের এই মানবিক উদ্যোগ ঝিনাইদহ তথা সারা দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
news@26banglatv.com