সারা বাংলা রাজশাহী সিরাজগঞ্জ
মেট্রোরেল দূর্ঘটনার কারণ এবং প্রতিকার বিষয়ে প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়ার মতামত।
২৬ বাংলা টিভি 18-Nov-2025 63
মেট্রোরেল দূর্ঘটনার কারণ এবং প্রতিকার বিষয়ে প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়ার মতামত।
আহসান হাবীব মানিক,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
বর্তমান ঢাকা মহানগর জনসংখ্যা দুই কোটির অধিক। এত বৃহৎ জনসংখ্যার যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। বিভিন্ন উপকরণ দ্বারা যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ভয়াবহ যানজটের কারণে ঢাকা শহরে বসবাসকারী জনগণ সময়, অর্থ এবং মানসিক যন্ত্রণার ক্রমাগত শিকার হচ্ছে। এতে ব্যক্তি সহ রাষ্ট্রের অপূরণীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রতিনিয়ত হচ্ছে।
এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সাবেক সরকারের আমলে অত্যন্ত ব্যয়বহুল মেট্রোরেলের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতকরণের প্রচেষ্টা হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু উহাতেও মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০% থেকে ১২% লোক উপকার পাচ্ছেন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উক্ত মেট্রোরেল প্রতিষ্ঠিত এবং চালু হয়েছে, তা কারিগরি ত্রুটির জন্য পরপর দুইবার দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে।
এমতাবস্থায় কারিগরি ত্রুটির অনুসন্ধানে নিম্নোক্ত তথ্যাদী সংশ্লিষ্ট মহলের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
---
মেট্রোরেল দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার – পর্যবেক্ষণসমূহ :
1. এই দুর্ঘটনা হয়েছে ডিজাইন ত্রুটি, নির্মাণ ত্রুটি, অথবা উভয়ের সমন্বয়ে।
2. জানা গেছে যে যে স্থানে তীক্ষ্ণ বাঁক (sharp turning point) ছিল, দুর্ঘটনাটি সেখানে ঘটেছে। একই ধরনের দুর্ঘটনা আগেও হয়েছে বলে জানা যায়।
3. বাঁকযুক্ত স্থানে উচ্চ গতিতে মেট্রো চলার সময় কেন্দ্রাভিমুখ বল (centripetal force) বেড়ে যায়। এতে ভেতরের পিয়ারের (inner pier) ওপর নিচের দিকে চাপ দ্বিগুণ হয়, আর বাইরের পিয়ারের (outer pier) ওপর নিচের চাপ কমে যায়। এর ফলে বাইরের পিয়ারের বেয়ারিং প্যাড থেকে নিচের চাপ হালকা হয়ে পড়ে এবং তখন অনুভূমিক বল (skipping force) সহজেই প্রভাব ফেলে।
4. বাইরের পিয়ারে উল্লম্ব চাপ কমে যাওয়ায় অনুভূমিক বলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কমে যায়। ফলে ঘর্ষণ শক্তি অতিক্রম করে বেয়ারিং প্যাড তার অবস্থান থেকে সরে যেতে (skip off) পারে এবং এভাবেই দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।
5. বাইরের পিয়ারে পিয়ার ক্যাপ ও নিওপ্রিন বেয়ারিং প্যাডের মধ্যে কোনো অ্যাঙ্করেজ সিস্টেম ছিল না। তাই উল্লম্ব লোড কমে যাওয়ার ফলে অনুভূমিক বল স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং বেয়ারিং প্যাড সরে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
6. আমার ধারণা—ডিজাইনার কেন্দ্রাভিমুখ বলের প্রভাব বিবেচনা করেননি; অর্থাৎ ট্রেন বাঁকে চলার সময় ভেতরের দিকে অতিরিক্ত চাপ বৃদ্ধি এবং বাইরের দিকে চাপ হ্রাস যে ঘটবে, সেটি তিনি হিসাব করেননি। যদি বাইরের পিয়ারে অ্যাঙ্করেজ সিস্টেম থাকত, তবে এই দুর্ঘটনা রোধ করা যেত।
7. বর্তমান বেয়ারিং প্যাড স্থাপনের পদ্ধতি সোজা ট্র্যাকের জন্য উপযোগী, কিন্তু বাঁকে এটি কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। ডিজাইনার প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা নেননি; বাঁক অংশকে সোজা ট্র্যাকের মতো ধরে ডিজাইন করেছেন। এখানেই ডিজাইনারের প্রযুক্তিগত ভুল রয়েছে।
8. তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ছাড়া ডিজাইনার হয়তো ভেবেছিলেন, শুধু ডেড লোড (superimposed load)–ই যথেষ্ট হবে বেয়ারিং প্যাড সরে যাওয়া রোধ করতে। কিন্তু বাঁকে ট্রেন চলার সময় অতিরিক্ত গতির কারণে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
9. ট্রেন চলার সময় লোড বাইরের দিক থেকে ভেতরের দিকে স্থানান্তরিত হয়, যার ফলে বাঁকের বাইরের দিকের পিয়ারে ডেড লোড কম চাপ সৃষ্টি করে—এতে বেয়ারিং প্যাড আরও ঢিলা হয়ে পড়ে।
10. প্রাথমিক পর্যবেক্ষণেই বোঝা যায়—বাঁক অংশে বিশেষ অ্যাঙ্করেজ সিস্টেম থাকা উচিত ছিল, কিন্তু তা রাখা হয়নি। যদি ডিজাইন সঠিক হত, তাহলে বেয়ারিং প্যাড কেন সরে গেল? এটি প্রমাণ করে যে ডিজাইনে ভুল ছিল এবং এর দায়িত্ব ডিজাইনারকেই নিতে হবে।
11. পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে—একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির রিপোর্ট ইঞ্জিনিয়ারদের জানার জন্য প্রকাশ করা জরুরি, যাতে ত্রুটি উপলব্ধি করে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
12. IEB হল সঠিক প্রতিষ্ঠান এই রিপোর্ট প্রকাশ করার জন্য। দেশবাসীর জানার অধিকার আছে যে দুর্ঘটনার কারণ কী। আমার ধারণা—এটি ডিজাইন ত্রুটি, নির্মাণ ত্রুটি নয়।
---
মন্তব্য :
1. ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধ করতে বাঁক অংশে মেট্রোর গতিসীমা অবশ্যই কমাতে হবে।
2. উচ্চ দক্ষতার বিশেষজ্ঞদের দ্বারা বাঁক অংশে বেয়ারিং প্যাডের জন্য অ্যাঙ্করেজ সিস্টেম তৈরি করতে হবে, যাতে বেয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার ঘটনা আর না ঘটে।
news@26banglatv.com