সারা বাংলা রাজশাহী সিরাজগঞ্জ
সরস্বতী পূজায় সিরাজগঞ্জে ৩০০ বছরের ঐতিহ্যের দই মেলা
২৬ বাংলা টিভি 23-Jan-2026 36
সরস্বতী পূজায় সিরাজগঞ্জে ৩০০ বছরের ঐতিহ্যের দই মেলা
সিরাজগঞ্জ থেকে :
সরস্বতী পূজা এলেই সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ফিরে আসে এক ভিন্ন রকম উৎসবের আমেজ। বিদ্যার দেবীর আরাধনার পাশাপাশি এখানে বসে প্রায় তিন শতাব্দীর পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দই মেলা। দইয়ের গন্ধ, মানুষের কোলাহল আর উৎসবের আনন্দে পুরো এলাকা যেন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল থেকেই তাড়াশ উপজেলার রশিক রায় মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় মেলার প্রস্তুতি চোখে পড়ে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার নামকরা ঘোষরা তাঁদের তৈরি দই নিয়ে হাজির হন এই মেলায়। দিনভর চলা এই দই মেলাকে ঘিরে স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও ভিড় করেন দর্শনার্থী ও ক্রেতারা।
মেলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি দইয়ের হাঁড়ি। কোথাও ক্ষীরসা দই, কোথাও শাহি দই, আবার কোথাও টক দই কিংবা ডায়াবেটিক দই। বগুড়ার শেরপুর, রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা, নাটোরের গুরুদাসপুরের শ্রীপুর, উল্লাপাড়ার ধরইল, পাবনার হান্ডিয়াল—প্রতিটি এলাকার দইয়ের রয়েছে আলাদা স্বাদ আর সুনাম। এসব মিলিয়ে শত শত মণ দই বেচাকেনা হয় এই একদিনেই।
দইয়ের পাশাপাশি মেলায় পাওয়া যায় ঝুড়ি, মুড়িমুড়কি, চিড়া, বাতাসা, কদমসহ নানা রকম গ্রামবাংলার মুখরোচক খাবার। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়ান মানুষ, কেনাকাটার ফাঁকে চলে গল্প আর আড্ডা।
ইতিহাস বলছে, চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ অঞ্চলের তৎকালীন জমিদার পরম বৈঞ্চব বনোয়ারি লাল রায় বাহাদুর এই দই মেলার সূচনা করেছিলেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি নিজে দই ও মিষ্টান্নের বড় ভক্ত ছিলেন। জমিদার বাড়িতে আগত অতিথিদের আপ্যায়নে ঘোষদের তৈরি দই পরিবেশন করতেন। সেখান থেকেই সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে জমিদার বাড়ির সামনে রশিক রায় মন্দিরের মাঠে দই মেলার প্রচলন শুরু হয়, যা আজও বহমান।
মেলায় দই বিক্রি করতে আসা স্বাধীন ঘোষ জানান, এবার তিনি প্রায় ১২–১৩ মণ দই এনেছেন। দইয়ের চাহিদা ভালো থাকায় দুপুরের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যাবে বলে আশাবাদী তিনি। তবে দুধের দাম, জ্বালানি, শ্রমিক ও দইয়ের পাত্রের খরচ বাড়ায় দইয়ের দাম কিছুটা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
দই কিনতে আসা ওমর সাহা বলেন, “প্রতি বছর সরস্বতী পূজার দিন সকালে এই মেলা থেকেই দই কিনি। পূজাকে ঘিরে বাড়িতে অতিথি আসে, তাদের আপ্যায়নে এখানকার দইয়ের জুড়ি নেই।”
আরেক ক্রেতা দীপ দাস বলেন, “বোন-জামাইসহ আত্মীয়স্বজন এসেছে। এখানকার দইয়ের স্বাদ আলাদা। প্রতিবছর ১০–১২ কেজি দই কিনি, তবে এবার দাম একটু বেশি হওয়ায় পরিমাণ কমাতে হয়েছে।”
তাড়াশ উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি গোপন চন্দ্র ঘোষ জানান, প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই দই মেলা প্রতিবছরের মতো এবারও সফলভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শীতের মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজার সঙ্গে মিলিয়েই এই মেলা বসে। ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এটি এখন তাড়াশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সময় বদলালেও তাড়াশের দই মেলা আজও ধরে রেখেছে তার স্বকীয়তা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া এই ঐতিহ্য আগামী দিনেও একইভাবে মানুষের আনন্দের ঠিকানা হয়ে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
news@26banglatv.com